বাংলাদেশে জুয়ার আসক্তির কারণে ঋণ খেলাপের ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৪০,০০০ কোটি টাকারও বেশি, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই জুয়ার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের। বিশেষ করে যুবক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে অনলাইন জুয়ার প্রভাবে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব: খেলাপি ঋণের চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট (২০২৩) অনুসারে, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৯.০৩% এ দাঁড়িয়েছে। এই খেলাপি ঋণে জুয়ার প্রভাব সরাসরি পরিমাপ করা কঠিন হলেও, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিগত ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে প্রায় ১৮% ঋণ নেওয়ার কারণ হিসেবে বিনোদন বা “জরুরি প্রয়োজনের” কথা উল্লেখ করেছেন, যার একটি অংশ অনুল্লিখিতভাবে জুয়ার সাথে সম্পর্কিত। নিচের সারণীতে ২০২০-২০২৩ সময়কালে খেলাপি ঋণের প্রবণতা দেখানো হলো:
| বছর | মোট খেলাপি ঋণ (কোটি টাকায়) | মোট ঋণের সাপেক্ষে খেলাপির হার (%) | ব্যক্তিগত খেলাপি ঋণের আনুমানিক বৃদ্ধির হার (%) |
|---|---|---|---|
| ২০২০ | ৯৪,৩৩১ | ৮.০৮ | ১২.৫ |
| ২০২১ | ১,০৩,২৭৪ | ৮.১৬ | ১৪.২ |
| ২০২২ | ১,২৫,২৫৭ | ৮.৯৬ | ১৭.৮ |
| ২০২৩ | ১,৪০,০০০+ | ৯.০৩ | ১৯.৫ (আনুমানিক) |
এই তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ব্যক্তিগত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির হার সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হারের চেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা এই বৃদ্ধির পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয়ভার এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত (যেমন জুয়া) থেকে অর্থ উত্তোলনের প্রবণতাকে দায়ী করছেন।
সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোয় প্রভাব
জুয়ার কারণে ঋণে জড়িয়ে পড়া শুধু অর্থনৈতিক সংকটই তৈরি করে না, এটি সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের ওপরও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, জুয়া ও ঋণ সংক্রান্ত সমস্যা যেসব পরিবারে থাকে, সেসব পরিবারে দাম্পত্য কলহের হার ৬০% বেশি এবং পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা প্রায় ৪৫% বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে, ঋণ শোধ করতে গিয়ে পরিবারের সঞ্চয়, জমি, এমনকি বাসস্থানও হারানোর ঘটনা ঘটে।
একটি উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক খুলনার এক যুবকের ঘটনা। সে একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করত এবং অনলাইন ক্যাসিনোতে জড়িয়ে পড়ে। প্রথমে ছোট অঙ্কের বাজি ধরতে শুরু করলেও, পরে বাংলাদেশ জুয়া প্ল্যাটফর্মের মতো সাইটগুলোর মাধ্যমে ক্রমাগত অর্থ ঢালতে থাকে। ঋণ শোধ করতে গিয়ে সে প্রথমে প্রভিডেন্ট ফন্ড, তারপর পরিবারের সঞ্চয় এবং শেষ পর্যন্ত পারিবারিক জমি বন্ধক দিতে বাধ্য হয়। এই একটি ঘটনা দেশের হাজার হাজার পরিবারের বাস্তব চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে।
আইনি কাঠামো ও বাস্তবতা
বাংলাদেশে পাবলিক গেমিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ এবং দ্য প্রিভেনশন অব গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৫৭ অনুযায়ী, জুয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো আইনের ফাঁক গলে সহজেই কাজ করছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো বিদেশি সার্ভার ব্যবহার করে এবং ডিজিটাল লেনদেনের জটিলতার কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কমিশন (বিটিআরসি) প্রতি বছর শতাধিক জুয়া সংক্রান্ত ওয়েবসাইট ব্লক করে, কিন্তু নতুন সাইটগুলি দ্রুতই তার জায়গা নেয়।
মনস্তাত্ত্বিক দিক: কেন মানুষ ঋণ নিয়ে জুয়া খেলে?
জুয়ার প্রতি আসক্তি একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। ‘লস অ্যাভারশন’ নামক একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন মানুষ হারানোর বেদনা অর্জনের সুখের চেয়ে বেশি তীব্রভাবে অনুভব করে। জুয়াড়ি যখন অর্থ হারায়, তখন সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য সে আরও বেশি বাজি ধরে, যা তাকে গভীর ঋণের দিকে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আর্থিক সাফল্যের চাপ এবং দ্রুত সমৃদ্ধি লাভের আকাঙ্ক্ষা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
সমাধানের পথ: সচেতনতা ও নীতিগত পরিবর্তন
এই সমস্যা মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, জুয়ার ক্ষতিকর দিক নিয়ে গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে, বিশেষ করে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমে এটি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত ব্যক্তিগত ঋণ প্রদানের সময় ঋণগ্রহীতার আয়ের উৎস ও ঋণ নেওয়ার প্রকৃত কারণ যাচাই করা। তৃতীয়ত, ডিজিটাল লেনদেন নজরদারি জোরদার করে জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ রোধ করতে হবে। সর্বোপরি, যারা জুয়ার আসক্তিতে ভুগছেন তাদের জন্য কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য জুয়া ও ঋণ খেলাপির এই সংযোগ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে এই সমস্যাটির উপর গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। এটি শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, বরং একটি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে হবে।